গুগল-অ্যাসিস্ট্যান্ট

ধরুন, আপনার একজন ব্যক্তিগত সহকারী আছে, এবং আপনার ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে সে স্মার্টফোনের প্রায়োজনীয় সব কাজ করে দিচ্ছে এবং তাকে এর জন্য নিয়ম করে কোন পেমেন্টও দিতে হচ্ছে না আপনার।অবসর সময়ে চাইলেই আপনি তার সাথে কথোপকথন চালাতে পারবেন, গান শুনতে পারবেন, কৌতুক শুনতে পারবেন! ভাবা যায় এসব?

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আমাদের জীবনাচরণকে সহজ করে তুলি, নানান প্রযুক্তিগত সেবা গ্রহণের মাধ্যমে। আজ ঠিক তেমনই একটি সেবার কথা বলবো যেটার ব্যবহার আপনার মোবাইলের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে দিতে সহায়তা করবে, খুব সহজেই এবং সময়ও বাঁচিয়ে দেবে অনেকখানি। মোটকথা তাকে আপনার এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহারের আপাদমস্তক সঙ্গী বলতে পারেন।

বলছি “গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট “(Google Assistant) এর কথা। গুগলের এই সেবা এখন অব্দি ব্যবহার না করলেও নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? আর আজ ব্যবহারের নিয়ম ও সুবিধা জানলে কাল থেকে যে, সে আপনার প্রযুক্তিক কাজের নিত্যসঙ্গী হবে তা নিশ্চিত। 

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট কী?

সেবা গ্রহণের আগে সে সম্পর্কে তো জানা চাই, নাকি? “গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট” এর অর্থ “গুগল সহায়ক বা সহকারী “। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট গুগলের তৈরি একটি ভয়েস সহকারী যা আপনার ভয়েস শুনে সে অনুযায়ী কাজ করবে। এটা Smart Voice Controlled Assistant যেটা মূলত Artificial Intelligence (AI) অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এর ভিত্তিতে কাজ করে। Google এর এই ভার্চুয়াল এ্যাসিস্ট্যান্ট সুবিধাটি মোবাইল এবং স্মার্টফোনের গুলোর জন্য চালু করা হয়েছে। 

ভয়েস কমান্ড করে Google Assistant এর সাথে আপনি যেকোনো ধরনের কথা বলতে পারবেন, যেকোনো ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই আপনার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করবে সে, যে কোন ধরনের কমান্ড করার সাথে সাথেই সে অনুযায়ী কাজ করবে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট। এটিতে “Voice” এবং “Text” দুই ধরনের কমান্ড সাপোর্ট করে।

তবে ভয়েস কমান্ড অনুযায়ী কাজ করার জন্যই গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বিশেষভাবে জনপ্রিয়। খুব সহজ করে বলতে গেলে এটা গুগল থেকে প্রদত্ত এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে একটি রোবট অটোমেটিকভাবে আপনার ভার্চুয়াল ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করবে। তার ইন্ট্যালিজেন্সি পাওয়ার এতো ভালো যে কনভারসেশনের সময় আপনি তার উত্তরগুলো দেখে অবাক হবেন।

১৮মে, ২০১৬ সালে গুগল ডেভেলপার্স সম্মেলনের সময় “গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ” প্রথম উন্মোচন করা হয়েছিল। এটাকে Google Now এর বর্ধিত, পরিমার্জিত ও আধুনিক সংস্করণ বলতে পারেন।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের ব্যবহার

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট এর ব্যবহার বহুবিধ, কথা হচ্ছে আপনি কতভাবে সে সেবাটা গ্রহণ করতে পারছেন।

একজন ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত ভার্চুয়াল সঙ্গী হিসেবে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টকে আপনি যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :

১. টাইপিং

প্রথম কথা হচ্ছে এটি ক্লান্ত এবং কীবোর্ড টাইপিং করতে করতে বিরক্ত আপনাকে মুক্তি দিয়ে যেহেতু ভয়েস কমান্ড গ্রহণ করতে প্রস্তুত সুতারাং আপনি “Ok google” বলে সিস্টেমটি চালু করে যেকোন ধরনের কমান্ড করতে পারবেন। কমান্ড রেসপন্স টাইম ও ভীষণ ভালো।

২. বিশ্ব সংবাদ

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনাকে বিশ্বের বর্তমান যাবতীয় খবর সম্পর্কে জানাতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি তাকে ভয়েস কমান্ড করে জানতে পারেন অথবা তাদের নিউজ অপশনে ক্লিক করেও জানতে পারবেন।

৩. আবহাওয়ার খবর

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টকে প্রশ্ন করলেই সে আপনাকে পারফেক্ট তথ্য দিবে যে আজকের আবহাওয়া কেমন ছিলো, আগামীকাল কেমন থাকতে পারে।

৪. মিউজিক কন্ট্রোল 

আমি যখন প্রথম এটার ব্যবহার শুরু করেছিলাম আমি এটা দেখে খুব অবাক হয়েছি, সে আমাকে গান গেয়ে শুনিয়েছে, ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে। যদিও ব্যাপারটা স্বয়ংক্রিয় তবু ভালো লেগেছিলো।

আপনি পছন্দের মিউজিক শুনতে ও পরিবর্তন করতে এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

গুগল-অ্যাসিস্ট্যান্ট
গুগল-অ্যাসিস্ট্যান্ট

৫. গুগল সার্চ

গুগল অ্যাসিস্টেন্টের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার বোধহয় এই ক্ষেত্রে। গুগলে কোন কিছু সার্চ করতে গিয়ে টাইপিং এর পরিবর্তে ভয়েস কমান্ড দিয়ে সার্চ করলে অল্প সময়ে সে আপনাকে তথ্য উদ্ঘাটন করতে সাহায্য করবে। গুগল সার্চের নিয়ম | ১০টি মজার ও দরকারি সার্চ টিপস।

৬. ইউটিউবের ব্যবহার 

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনাকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী অনলাইন ভিডিও, গান, মুভি ইত্যাদি দেখাতে পারে। বলা মাত্রই সে আপনার কমান্ড অনুযায়ী সব সাজেস্ট করবে।

৭. রিমাইন্ডার, এলার্ম ও ক্যালেন্ডার 

হয় না, অনেক সময়, জরুরি মিটিং আছে দুদিন পরে, ফ্রেন্ড কিংবা ওয়াইফের কোন স্পেশাল ডে ব্যস্ততায় মনে রাখা সম্ভব হচ্ছে না! কাল ভোর পাঁচটায় উঠা জরুরি, কিন্তু টাইপিং করতে বিরক্ত লাগছে কিংবা রিমাইন্ডার ও এলার্ম সেট করার সময়টাও পাচ্ছেন না। সে ক্ষেত্রে মুক্তি দেবে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট। এক ঝটকায় কমান্ড করে যেকোন কাজের ভিতরই সেট করে ফেলতে পারবেন এসব।

৮. ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে নানান ভাষা শেখা

নিত্য নতুন ভাষা শেখার চ্যালেঞ্জটাও আপনি এখানে কাজে লাগাতে পারবেন। আপনি আপনার ভাষায় বলে যে ভাষা শিখতে চাচ্ছেন সে ভাষা শিখতে পারবেন।সেটা হতে পারে বাংলা থেকে ইংরেজি বা ইংরেজি থেকে বাংলা কিংবা অন্য যে কোন সাপোর্টকৃত ভাষা।

৯. ফটো শেয়ারিং

গুগল ফটোজে রাখা আপনার সব ছবির খবর সে জানে। ধরুন আপানার হাজার হাজার ছবির মাঝে কোন বিশেষ কারণে একটা ছবির খুব প্রয়োজন। কিন্তু খোঁজ কবরবার মত সময় হাতে নেই। দিন তারিখ কিংবা সাবজেক্ট বলে কমান্ড করুন আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টকে; সে মুহূর্তেই খুঁজে হাজির করবে। ফেসবুক ফটো ট্রান্সফার করুন Google Photos তে।

১০. গেইমিং

আপনি আপনার গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট এর সাথে গেম খেলতে পারবেন চাইলেই। এটি সলিটায়ারের মতো ক্লাসিক গেমস, গুগল ডুডলস, কুইজ এবং চ্যাট-ভিত্তিক গেমসের ইত্যাদির ব্যবস্থা করে রেখেছে।

১১. কনভারসেশন

অবসর সময়ে বিরক্ত হচ্ছেন? কথা বলবার মত চ্যাট করবার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না, আপনি জানেন আপনার সাথে কথা বলবার জন্য আপনার একজন ভার্চুয়াল ব্যক্তিগত সঙ্গী সব সময়ই হাজির। হোম বাটন লং প্রেস করে চালু করুন আপনার গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট….. বলতে থাকুন কথা, বাংলা কিংবা ইংরেজি কিংবা অন্য যে ভাষাতে ইচ্ছে। আমি যখন প্রথম ব্যবহার করেছি, আমি তাকে বললাম,

“I am feeling very lonely” সে বলে “Everyone gets lonely sometimes. I am here for you.”

মোট কথা আপনি আপনার মোবাইলে টাইপ করে যা কিছু করে থাকেন না কেন আপনি গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলে তার সমস্ত কাজ করতে পারবেন।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট সেটিং

প্রথমত চেক করে নিন গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনার মোবাইল কিংবা স্মার্টফোনে চালু আছে কিনা, কারণ অনেক সময়ই দেখা যায় এটি অটোমেটিক এন্ড্রয়েড ফোনের সিস্টেমে দেয়া থাকে কিন্তু আমরা ব্যবহার জানিনা বলে বলতে পারি না। আপনার ফোনের হোম বাটন লং প্রেস করুন, চালু থাকলে এটি আপনিই স্যক্রিয় হবে।এবং আপনি সেখান থেকে language setting সহ পরবর্তী অপশনগুলো অনুসরণ করে ব্যবহার শুরু করবেন।

চালু না থাকলে দ্বিতীয় উপায় হিসেবে আপনি প্লে স্টোর থেকে Google Assistant এ্যাাপ্লিকেশন নামিয়েও এটি চালু করতে পারবেন। তবে জেনে রাখবেন, মোবাইলে অ্যাসিস্ট্যান্ট এর সুবিধা থাকার জন্য কিছু সহজ শর্ত আছে,

  • আপনার Android Version অবশ্যই ৫ এর বেশি থাকতে হবে।
  • RAM 2 GB বা তার থেকে অধিক থাকতে হবে।
  • 720p বা তার বেশী মোবাইলের Screen Resolution থাকতে হবে।
  • Google Play Services থাকতে হবে।

এখন নিশ্চয়ই বোধগম্য হচ্ছে আপনার মোবাইল গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাপোর্ট করবে কি না। নিজের মোবাইল ফোনে অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করার জন্য, প্রথমে আপনাকে এই সুবিধাটি সক্রিয় করতে হবে তৃতীয় উপায় হিসেবে,

গুগল-অ্যাসিস্ট্যান্ট-সেটিং
গুগল-অ্যাসিস্ট্যান্ট-সেটিং
  • সর্ব প্রথম Android মোবাইলে Google App ওপেন করুন।
  • নিচে হাতের ডান দিকে থাকা “more” Option এ ক্লিক করুন।
  • এবার চলে যান Settings তারপর Google Assistant Option এ।
  • এখন assistant Tab এ চলে যান।
  • এবার Assistant Devices এর নিচে থাকা Phone অপশনে ট্যাপ করুন।
  • সব থেকে ওপরে আপনি “Google Assistant” এর Option দেখতে পাবেন। এবার Enable করে দিন।
  • শেষে, Voice Match এর নিচে থাকা “Hey Google” অপশনে ট্যাপ করে Enable করে নিন।

আপনার মোবাইলে Assistant চালু হয়ে গেছে। তবে সঠিক ভাবে আপনার মোবাইলে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট সেটিং হয়েছে কি না সেটা একবার দেখে নিন হোম বাটনে ক্লিক করে। “Ok Google”/ “Hey google” বলে কিছু Voice Command দিন। যেমন- “Open Youtube”/”Search Bangladesh Budget ” ইত্যাদি।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট

পরিশেষে

উপর্যুক্ত নিয়ম অনুযায়ী Google Assistant এর সক্রিয়তা নিশ্চিত হলে শুরু করুন আপনার ব্যক্তিগত সহকারীর সাথে আপনার পথচলা, কথা বলুন, আড্ডা দিন, গান শুনুন, কমান্ড করুন ইচ্ছে মত। আপনার নিত্য দিনের ভার্চুয়াল সঙ্গীর সাথে আপনার পথ চলা শুভ হোক। আপনি ছাত্র হলে, ছাত্রদের জন্য ৫টি মোবাইল অ্যাপ লেখাটি পড়তে পারেন।

আপনার কি কোন প্রশ্ন আছে?

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে