ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে

প্রতিদিন তো কত সেলফি আর ছবি তোলেন, কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে? ভেবে না দেখলেও সমস্যা নেই কেননা, আজকের লেখা পড়লে জেনে যাবেন, ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে?

যন্ত্র চালিত চোখ! শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছেন নাকি? অবাক হওয়ার কিছুই নেই। মোটামুটি কম বেশি সবাই আমরা এই ব্যাটারি চালিত চোখ ব্যবহার করেছি, আর তা হলো ক্যামেরা। কিন্তু কখোনো কি ভেবে দেখিছি, কিভাবে মানবচক্ষুর ন্যায় কৃত্রিম ল্যান্সের সাহায্যে এটা ছবি ধারন করে কেমনে?

চলুন তাহলে বিস্তারিত পড়ে নেই কিভাবে এর সম্পূর্ণ কাজটা হয়ে থাকে। এই লেখাটিতে আমরা ক্যামেরার ইতিহাস, কাজ করার প্রক্রিয় ও প্রকারভেদ নিয়েও আলোচনা করবো। ভূমিকা লম্বা না করে, মূল আলোচনায় চলে যাওয়া যাক।

ক্যামেরার ইতিহাস

সৃষ্টির শুরু থেকেই এই ক্যামেরার প্রচলন ছিল না। বিজ্ঞানের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তা আমাদের মাঝে এসেছে আশীর্বাদ রুপে। কত মধুর স্মৃতি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভূতিকে আমরা বন্দি করি এই যন্ত্রে। সময়কে ধরে রাখতে এর বিকল্প কি আছে? ইরাকের একজন বিজ্ঞানী (ইবন-আল-হাইতাম) তিনি আলোক বিজ্ঞানের ওপর সাত খন্ডের একটি বই রচনা করেন।

বইটির নাম ছিল কিতাব আল মানজির, এটি একটি আরবি ভাষার বই। সেই বইটিই ছিল ক্যামেরা আবিষ্কারের সূত্রের উৎস। বহু বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে কাজ করলেও বানিজ্য নিয়ে প্রথম কাজ করেন “জর্জ ইস্টম্যান”। তিনি আঠারোশো পচাশি সালে তার প্রথম ক্যামেরা কোডাক এর জন্য পেপার ফিল্ম তৈরি করেন। এরপর থেকে ক্যামেরা এর আমূল পরিবর্তন ঘটেছে এবং অনবরত হয়েই চলেছে।

ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে?

ক্যামেরার ভিতর এমনভাবে তৈরি যেন ল্যান্স বাদ দিয়ে, কোনোরকম আলো না আসতে পারে। ল্যান্সের ভেতরে যখন আলো প্রবেশ করে তখন ই ক্যামেরার ভিতর একটি উল্টো, সরল প্রতিবিম্ব গঠন করে। প্রতিবিম্ব গঠনের স্থানটিতে থাকে ক্যামেরার ফিল্ম। এটি সেলুলয়েডের অথবা প্লাস্টিকের তৈরি।

এর গায়ে সিলভার হ্যালাইডের প্রলেপ দেয়া থাকে। সিলভার হ্যালাইড আলোর সাথে বিক্রিয়া ঘটায়। এর পরিমান আলোর কম বেশি এর সাথে সাথে উঠা নামা করে। আলো বেশি হলে বেশি বিক্রিয়া, এবং কম হলে কম বিক্রিয়া।

এছাড়া বাইরে থেকে অতিরিক্ত আলো আসার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এটি আলোকরুদ্ধ প্রক্রিয়া। এই সূত্র অনুযায়ী ই অবিকল ছবি তৈরি করে একটি ক্যামেরা। কিন্তু এটিই শেষ না, হাইপো নামের একধরনের রাসায়নিক দ্রবনে এই ফিল্মকে ধুয়ে নিতে হয়।

ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে ছবি সহ
ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে DSLR

ক্যামেরার যেখানে বিক্রিয়া ঘটেছিল সেখানের “সিলভার হ্যালাইড” হাইপো দ্রবনের প্রভাবে উঠে যায়। এবং একটি নেগেটিভ কপি পাওয়া যায়। এই নেগেটিভ থেকে কিভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আসে? উত্তর হলো, এই নেগেটিভের মধ্যে আলো প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বিক্রিয়ার স্থানে আলো প্রবেশ করে এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় ছবিটি প্রিন্টেড হয়।

আরও পড়ুন: মাইক্রোফোন কিভাবে কাজ করে?

এ তো গেলো এনালগ ক্যামেরার গল্প! এবার আসা যাক ডিজিটাল ক্যামেরার কথায়। এখানে নেই ফিল্মের ঝামেলা। এই ক্যামেরা গুলোতে ডট মেট্রিক পদ্ধতিতে তৈরি করা একটি সোলার সিস্টেম থাকে। এই সোলার সিস্টেম এর উপর আলো পড়লে বিদুৎ উৎপন্ন হয়। এই বিদুৎ হলো কম্পনমান বিদুৎ।

তখন ক্যামেরা এই বিদুৎ এর কম্পন মানকে গননা করে এনকোডার নামক স্থানে প্রেরণ করে এবং এটি সাথে সাথে এই মানকে বাইনারি মানে পরিণত করে (কম্পিউটার শুধু বাইনারি মানে ০ এবং ১ বুঝে। বাইনারি নিয়ে অন্য কোন দিন আলোচনা হবে) এবং এপ্লিফাই করে সংরক্ষণ করে থাকে। পরে ফটো ফরম্যাট করা হয় যেমন jpg/png/jpeg ইত্যাদি ফরম্যাটে। পরে এই ফাইলগুলো ওপেন করলে দেখা যাবে হুবহু আমাদের তোলা ছবিটি।

এনালগ বনাম ডিজিটাল ক্যামেরা

এই প্রশ্নের উত্তরে সবসময়ই এগিয়ে থাকবে, ডিজিটাল নিঃসেন্দহে! এনালগের ছবি প্রিন্টারের সাহায্যে প্রিন্ট করতে হয়, অথবা ক্যামেরার ফিল্ম রেখে দিতে হয় যত্নসহ; হারিয়ে গেলেই শেষ! অপর দিকে ডিজিটালে আপনি পাচ্ছেন মেমোরি সুবিধা, যা আপনার হাজারো স্মৃতি বন্দি করে রাখে যত্নে। আর কম্পিউটারেও রেখে দিতে পারেন। ইচ্ছা হলেই দেখতে পারেন।

ক্যামেরার প্রকারভেদ

ফটোগ্রাফিক পুরাতন ক্যামেরাগুলো দুই প্রকার যথা:

  • টিএলআর
  • এসএলআর

টিএলআর ক্যামেরা কি?

পূর্নরুপ হলো টুইন ল্যান্স রিফ্লেক্ট ক্যামেরা। শুরুর দিকের কমপ্যাক্ট ক্যামেরাগুলোতে এই টিএলআর ব্যাবহৃত হতো। এতে দুটি ল্যান্স থাকতো।একটি ল্যান্স দিয়ে ফটোগ্রাফার সাবজেক্ট কে দেখতেন। আর অন্যটি ব্যাবহৃত হতো এক্সপোজার হিসেবে।

তবে, এক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যেমন ফটোগ্রাফার ভুলবসত নিচের এক্সপোজারের ক্যাপ বা ঢাকনা না খুললে এক্ষেত্রে কোনো ছবি উঠে না। এই সমস্যার সমাধানেই পরবর্তীতে আসে এসএলআর ক্যামেরা

এসএলআর ক্যামেরা কি?

এর পূর্নরুপ হলো সিঙ্গেল ল্যান্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা। এই ক্যামেরাটিতে একটি ল্যান্সের মাধ্যমেই সাবজেক্ট ফোকাস এবং ছবি তোলার কাজ দুটিই হয়ে থাকে।

ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে ছবি সহ 2
ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে ছবি সহ

এবার আসা যাক ডিজিটাল ক্যামেরার দিকে।

ডিজিটাল ক্যামেরায় এসএলআর এর বৈশিষ্ট্য থাকে যেগুলোয় সেগুলো ডিএসএলআর। অর্থ ডিজিটাল সিঙ্গেল ল্যান্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা।

ডিএসএলআর আবার দুই প্রকার

  • কমপ্যাক্ট
  • ইন্টার চেন্জঅ্যাবল

কমপ্যাক্ট ক্যামেরাতে ল্যান্স এডজাস্ট করা যায় না ।আর ইন্টার চেন্জঅ্যাবল ক্যামেরাতে বিভিন্ন মাপের ল্যান্স ব্যাবহার করা যায়।

আরও পড়ুন: স্পিকার কিভাবে কাজ করে?

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যামেরার ব্যবহার

ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে
ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে

বাংলাদেশে বহুল ব্যাবহৃত একটি ডিভাইস ক্যামেরা। সিসিটিভি ক্যামেরা,মোবাইলের ক্যামেরা, ডিএসএলআর ক্যামেরা বহুল ব্যবহৃত আমাদের দেশে। নিরাপত্তার কাজে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। বড় বড় শপিংমল থেকে রাস্তার ছোটো দোকানেও সিসিটিভি ক্যামেরা দেখতে পারবেন।

ক্যামেরা এর উপকারিদিক বনাম অপকারী দিক

আশা করছি উপরের সম্পূর্ন লেখা পড়ার পর, উপকারি দিকের আর কোনো কিছু বলার থাকে না। সবকথার এক কথা, ছবি তোলা চাই! সে যাই হোক। উৎসব হোক বা উৎসব না হোক। ছবি প্রায় প্রতিদিনই তোলা হয়। কেউ প্রকৃতির ছবি তোলে, কেউ পছন্দ করে রাস্তার ধারের জীবন জীবিকা গল্প তুলে ধরতে।

এবার আসি অপকারী দিক। এছাড়া আমরা চাইলেই কিন্তু এই একটা মোবাইলের ক্যামেরা দিয়েই কিন্তু ধারন করতে পারি সমাজের নানান অসঙ্গতিমূলক কর্মকাণ্ড এবং তুলে ধরতে পারি আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ক্যামেরার শক্তি এতটাই যার মাধ্যমে কিন্তু অনেক বড় বড় কর্ম সিদ্ধি করা যায়। অসহায় দুস্থ মানুষের সাহায্য এর জন্য দরকার বড় ফান্ড । কোথা থেকে আসবে এত টাকা! এর সমাধান ও কিন্তু ক্যামেরার কাছে। ক্যামেরার মাধ্যমে বন্দি করুন দৃশ্য এবং তুলে ধরুন জনসমাজের কাছে।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রত্যেকটা জিনিস এর ভালো খারাপ দিক থাকে। ক্যামেরাও তার বাইরে নয়। বর্তমানে হিডেন ক্যামেরা বা গোপন ক্যামেরা এর মাধ্যমে সহজেই কিছু অসাধুচক্র মানুষের ব্যাক্তিগত বিষয় অবগত হয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে। এছাড়াও ক্যামেরার ব্যাটারি পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া এর আরো নানারকম অপকারী দিক আছে।

আপনার একটি ছবি হাজারো শব্দের প্রকাশ ঘটায়। তাই তো বিশ্ব জুড়ে এই যন্ত্রটির উন্নয়নে কাজ করছে শত শত প্রতিষ্ঠান। মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলক প্রয়োগ ঘাটাচ্ছে শুধুমাত্র ক্যামেরা এর উপর।

কারন? এর উত্তর একটাই, আমরা ভালোবাসি ছবি তুলতে, মুহূর্তকে ধরে রাখতে। মুহূর্ত টা তো ধরে রাখতে পারিনা, শুধু ছবি রাখতে পারি। তাই এত আয়োজন। সেই দুইশত বছর আগের ক্যামেরায় বিষয়টি কিন্তু থেমে নেই। এর উন্নয়ন চলছেই, কে জানে! আগামী কয়েক বছরে ভবিষ্যতের ক্যামেরাটি হবে আরো অনেক বিস্ময়কর। আমরা সেই অপেক্ষায় রইলাম।

পরিশেষে

ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে এ নিয়ে আশা করি সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছেন। এবার, আইপি ক্যামেরা নিয়ে জানার আগ্রহ থাকলে, আইপি ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে এই লেখাটি পড়তে পারেন।

আপনার কি কোন প্রশ্ন আছে?

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে